Post Image

আমি সুলতান আব্দুল হামিদ রাহিমাহুল্লাহেরও সমালোচক। আপনি হয়ত বলবেন, কেন? তিনি তো খুব ভাল ছিলেন। আমি তার সমালোচনা করার অর্থ এই না যে, আমি তার গুণগুলোকে অস্বীকার করছি। তবে তিনি একজন ব্যর্থ রাজনৈতিক ছিলেন। তিনি তুর্কি তরুণদের বিপ্লবকে ঠেকাতে পারেননি। এটা যতই প্যাঁচান, প্রমাণিত বিষয়। তার ইমান, আমল ও ইখলাস- এসব বিষয় তার রাজনৈতিক এই ব্যর্থতা ঢাকার জন্য যথেষ্ট নয়। এখন আমি কি তার বিরোধী? কখনোই না। আমি তার বিরোধিতার জন্য তার সমালোচনা করছিনা। নিজেদেরকে শোধরাতে ও একই ভুল দ্বিতীয়বার না দোহরানোর জন্য সমালোচনা জারি রাখছি।

হাসানুল বান্না রাহিমাহুল্লাহ গত শতাব্দীতে ইসলামি উত্থানের জন্য প্রচেষ্টা করেছিলেন। অনেকগুলো থিউরিই উনি কয়েক দফায় প্রচার করেছিলেন। কতগুলো নিজেই রদ করে আরেকটা থিউরির উত্থান ঘটিয়েছিলেন। উনার প্রচেষ্টা ও চিন্তা করার যোগ্যতা অবশ্যই উত্তম ছিল। তবে তিনি পড়াশোনায় বহুমুখী চিন্তাধারার চর্চা করেন, যার কারণে তার কার্যক্রমে বিভিন্ন দিকের প্রভাব দৃষ্ট হয়। তার অনেকগুলো থিউরিই মুসলিম সমাজে বেশ চর্চিত হয়েছে। বেশিরভাগই উত্তম থিউরি ছিল, যার সুফল মুসলিম জাতি ভোগ করছে। তবে অনেকগুলো থিউরিতে তার ইজতিহাদি ভুল ছিল। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার ফ্রেমওয়ার্ক। আমি ফ্রেমওয়ার্ক নামই দিলাম, কারণ এটার চেয়ে উপযুক্ত শব্দ এক্ষেত্রে আর দেখছিনা।

হাসানুল বান্নার জীবদ্দশাতেই সিরিয়া, ইরাক ও ফিলিস্তিনসহ ৬টি তৎকালীন আরব রাষ্ট্রে ইখওয়ানের অফিশিয়াল কার্যক্রম শুরু হয়। আমি খেয়াল করিয়ে দিব, ফিলিস্তিন তখনো অফিশিয়ালি মুসলিমদের অধীনেই ছিল। যদিও একটা অস্পষ্ট ঝামেলা ও চক্রান্ত চলমান ছিল। এগুলোর সীমানাও অনেক বিশাল ছিল। তার পাশাপাশি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হবার পথেই ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক কারিগর মাওলানা মওদুদি রাহিমাহুল্লাহের সাথে হাসানুল বান্নার আত্মিক ও আদর্শিক সম্পর্ক ছিল। হাসানুল বান্না খিলাফত নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। তখন উসমানি খিলাফত পতনের মাত্র তিন দশক পেরিয়েছিল। পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও চলমান ছিল। পুরো বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদীদের উত্থান-পতন নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিল। এমন সময়ে তিনি বিভিন্ন দেশে ইখওয়ানের কার্যক্রম শুরু করেন।

হাসানুল বান্নার চিন্তাধারা ছিল, প্রতিটি রাষ্ট্রে ইখওয়ানের সরকার প্রতিষ্ঠা করার পর সেখান থেকে একজনের নেতৃত্ব মেনে নেয়া হবে। এই চিন্তায়ই হয়ত মুহাম্মাদ আলি জিন্নাহের সাথেও তিনি যোগাযোগ ও বৈঠক করে থাকবেন। উপমহাদেশ বৈশ্বিক রাজনীতিতে শক্ত প্রভাব রাখে, যেটা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছিল। এছাড়াও অন্যান্য দেশের ইসলামি চিন্তাবিদ ও ব্যক্তিত্বদের সাথে তিনি যোগাযোগ জারি রাখেন ও খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।

১৯৪৮ সালের ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মাত্র নয় বা দশ মাসের মাথায় হাসানুল বান্না রাহিমাহুল্লাহ শহিদ হয়ে যান। তবে ইখওয়ানের কার্যক্রম থেমে যায়নি। বরং তার শাহাদাতের পর যেন ইখওয়ানের কার্যক্রমে জোয়াড় আসে। তবে মিসরীয় গভর্নর ইখওয়ানকে শক্ত হাতে দমন করার শপথ নিয়ে কাজ করতে থাকে। এর মধ্যে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের বিপ্লবসহ বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিভিন্ন পালাবদল ঘটতে থাকে।

সাইয়েদ কুতুব ও আব্দুল্লাহ ইউসুফ আযযাম রাহিমাহুমাল্লাহ ইখওয়ানের চিন্তাধারাকে নাজদি ধারা দ্বারা অনেকটা ফিল্টার করে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। এতদ্ব্যতীত গত শতাব্দীর শেষ পঞ্চাশ বছরে উত্থান ঘটা প্রায় প্রতিটি জিহাদি দলগুলো ইখওয়ান দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আল কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা উসামা বিন লাদেন রাহিমাহুল্লাহ ও আইমান আয যাওয়াহিরি একসময় ইখওয়ানের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তাদের সাথে ইখওয়ানের দ্বন্দ্ব এই ছিল যে, ইখওয়ান সামরিক কার্যক্রমে কেন আসছেনা। ইখওয়ান তখন রাজনৈতিক কার্যক্রমে অনড় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

উসামা বিন লাদেন যখন উপমহাদেশে আল কায়েদা প্রতিষ্ঠা করেন, তখন হরকতুল জিহাদ ও লশকরে তইয়েবার মত উপমহাদেশের প্রভাবশালী জিহাদী দলগুলো নিষ্ক্রিয়প্রায় হয়ে পড়ে। কারণ বেশিরভাগ তখন আল কায়েদাতে যোগদান করে। উপমহাদেশীয় দলগুলো পাকিস্তান সরকারকর্তৃক প্রভাবিত ছিল। কিন্তু আল কায়েদার ফলে সেই প্রভাব কেটে গিয়ে ইখওয়ানের প্রভাবটা শক্তিশালী হয়। পাশাপাশি আরবের নাজদি চিন্তাধারার প্রভাবও এখানে স্পষ্টতঃ দৃশ্যমান হয়। হাসানুল বান্নার মৃত্যুর পর একটা সময় সাইয়েদ কুতুবসহ আরো কিছু ইখওয়ানের চিন্তকরা নাজদি ধারা দ্বারা প্রভাবিত হন। আল কায়েদা মৌলিকভাবে নাজদি ধারাকে গ্রহণ করে থাকে। তবে কিছু চিন্তাধারায় ইখওয়ানের প্রভাব থেকে গিয়েছে। যার মধ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার এই ফ্রেমওয়ার্ক অন্তর্ভুক্ত। টুইনটাওয়ার হামলার পর উসামা বিন লাদেন রাহিমাহুল্লাহ প্রবলভাবে বৈশ্বিক আলোচনায় চলে আসেন। যার কারণে বৈশ্বিক বিভিন্ন অঞ্চলের জিহাদি দলগুলো আল কায়েদার সাথে যুক্ত হতে আগ্রহী হয়। তখন অন্যান্য সালাফি ও মাযহাবি জিহাদি দলগুলো তখন আল কায়েদা কর্তৃক ইখওয়ানের ফিল্টার করা চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়।

মোটাদাগে সবগুলো জিহাদি দলই বর্তমানে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য হাসানুল বান্নার ফ্রেমওয়ার্ককেই অনুসরণ করে। তাদের দাবি, প্রতিটি ভূমিতে পৃথক পৃথকভাবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর একক নেতৃত্বে চলে যাবে। এই দাবিটি কতটা অবাস্তব সেটা পতনের পূর্বে আব্বাসি খিলাফতের ভাঙনের ইতিহাসগুলো পড়লে স্পষ্ট হয়ে যাবে। রাজনৈতিক ও ভৌগলিক কারণে নুরুদ্দিন জিনকি ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রাহিমাহুমাল্লাহদের মত মহান ব্যক্তিত্বরাও খিলাফতের সাথে যুক্ত হতে পারেননি।

মৌলিকভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থাসমূহের মধ্যে কেবল সাম্রাজ্য ব্যবস্থাপনাই খিলাফতের সমপর্যায়ের ভূমিকা রাখতে পারে। খিলাফত শব্দের শ্রেষ্ঠত্ব অবশ্যই রয়েছে। তবে সাম্রাজ্যে যেভাবে রাজ্যের নির্দিষ্ট সীমা থাকেনা, বিজিত প্রতিটি অঞ্চল একই সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়; সম্রাটের উপর কোনো শর্তারোপ থাকেনা- খিলাফতেও তদ্রুপ। আসলে খিলাফতের মূল শক্তিই হচ্ছে সাম্রাজ্য ব্যবস্থা। তবে সাম্রাজ্য কিন্তু কুফুরির ব্যবস্থাও হতে পারে, আবার ইসলামি খিলাফতেরও হতে পারে। এক বাক্যে বলা যায়, সকল খিলাফতই সাম্রাজ্য; কিন্তু সকল সাম্রাজ্য খিলাফত নয়। গত শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদীদের যুলুম দেখিয়ে সাম্রাজ্যের মূলোৎপাটন করা হয়। মৌলিকভাবে এতে বিশ্বের যুলুমের বিন্দুমাত্র কমতি হয়নি, বরং একশ থেকে হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ আর খিলাফতের ধারণা বনাম বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থাসমূহ নিয়ে কখনো আলোচনা করার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ তায়ালা তাওফিক দিলে হয়ত দ্রুতই কখনো করব।

বর্তমান জিহাদি দলগুলো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সাহস করতে পারছেনা। তারাও অনেকটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলোর প্রভাবেই এগিয়ে যাওয়ার কাজ করে থাকে। জনে জনে দাওয়াত পৌঁছানোকে সফলতা মনে করা, যুদ্ধের জন্য দাওয়াত ও মিডিয়া শক্তিশালী মাধ্যম অনুভূত হওয়া- এগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রভাব। যারা সাম্রাজ্য ব্যবস্থার জন্য যুদ্ধ করে, তারা এসবে এগিয়ে থাকলেও এগুলোকে মৌলিক হিসেব করে কখনোই কাজ করবেনা। জিহাদি দলগুলোর ফ্রেমওয়ার্ক যেহেতু গণতান্ত্রিক ইখওয়ান থেকেই আমদানি করা। সে হিসেবে কিছুটা প্রভাব থাকা অসম্ভব কিছু নয়। এছাড়া বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করার মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করতেও এই ফ্রেমওয়ার্কটি কাজ করে।

সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আরেকটা মৌলিক কার্যক্রম আছে। যেটা নিয়ে কথা বলতেও কেউ সাহস পান না, কেউ কথা বললে তার থেকে সবাই দূরে থাকেন। সেটা হচ্ছে, আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। সাধারণতঃ একটা সাম্রাজ্য, চাই সেটা খিলাফত হোক বা না হোক; প্রতিষ্ঠার জন্য আবশ্যক বিষয় হচ্ছে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। ইতিহাসের শিক্ষাও এটাই। আক্কাদ থেকে ব্রিটিশ পর্যন্ত প্রতিটি সাম্রাজ্য যার প্রমাণ।

খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য হাসানুল বান্না রাহিমাহুল্লাহের ফ্রেমওয়ার্কের বিপরীতে আরেকটা কার্যক্রম আছে। সেটা হচ্ছে, মুসলিমদের জন্য দল, দেশ ও অঞ্চল থেকে বের হয়ে সামগ্রিক চিন্তা করা। এটা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বিষয় নয়, তবে খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। এটার কয়েকটা ধারা আছে। কিছু সম্ভব, আর কিছু অনেক বেশি কঠিন। সামগ্রিকভাবে চিন্তা করার জন্য দলীয় সীমা থেকে বের হওয়াটা অধিক জরুরি। নেকি-বদির সীমা ছাড়িয়ে মুসলিম-অমুসলিমের সীমানায় আসতে হয়, মুসলিমদের আভ্যন্তরীণ সকল বিতর্ক থেকে উর্ধ্বে থাকতে হয়।

গত একশো বছরে অনেক মহান ব্যক্তিত্ব ইসলামের জন্য কাজ করে গেছেন। কাজগুলো মোটেও ছোট কিছু নয়। কিন্তু উম্মাহর অভিভাবক কেউ এখন পর্যন্ত আসেননি। আফিয়া সিদ্দিকিরা “ওয়া মু’তাসিমা” বলে ডাকার মত কাউকে পায়নি। আসিফা বানুরা নিষ্পেষিত হয়েছে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মত যালিম ব্যক্তিত্ব দিল্লি অভিমুখে কাউকে পাঠাননি। আমি বলছিনা, যারা ছিলেন; তারা খুব ছোট বা অকাজের ছিলেন। যেমনিভাবে, আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু হাদিসশাস্ত্রে শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও খিলাফতের দায়িত্বে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সমান নন বা বারা ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বীরত্বে শ্রেষ্ঠ হওয়ার পরও খালিদ বিন ওয়ালিদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেননা। আসলে উম্মাহর অভিভাবকত্ব অনেক বড় সাহস ও হিম্মতের বিষয়। সেটাও সমস্ত বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে করাটা আরো কঠিন একটা বিষয়। হুটহাট যেকারো দ্বারা এই কাজটি করা, বিশেষতঃ শুরু করা খুব একটা সম্ভব নয়।

পরবর্তী
সময়ের গুরুত্ব সংক্রান্ত আলোচনা

ইউসুফ at 9:45 অপরাহ্ন, আগস্ট 29, 2021 - Reply

সুন্দর লিখেছেন। কিন্তু অভিভাবকটা কে হবে?

আ হ ম সাকিব at 10:22 অপরাহ্ন, আগস্ট 29, 2021 - Reply

হবে কেউ। এই ফ্রেম থেকে বের হয়ে। কাউকে না কাউকে তো হতেই হবে।