Post Image

২০০৩ সালের ৩০শে মার্চ পুলিশের ইউনিফর্ম পড়া কয়েকজন লোক আফিয়া সিদ্দিকিকে গ্রেফতার করে। যেটা স্থানীয় অনেক পত্রিকায় সংবাদ হিসেবে স্থান পেয়েছিল। জনশ্রুত আছে যে, সেসব ইউনিফর্ম পরিহিত লোকেরা আইএসআইয়ের সদস্য ছিল। কিন্তু পাকিস্তানি সরকার এখন পর্যন্ত যেটা স্বীকার করেনি। ২০০৪ সালের মে মাসে আমেরিকা আফিয়াকে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় যুক্ত করে। আমেরিকার দাবি, ২০০৩ সাল থেকে আত্মগোপন করে ছিলেন আফিয়া সিদ্দিকি। ২০০৮ সালে তাকে গজনি হতে গ্রেফতারের দাবি করে আফগান পুলিশ। এরপর একটি কেসে তাকে ২০ বছরের সাজা দেয়া হয়। ২০১০ সালে তাকে আমেরিকায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আপিলের পর একই কেসে তাকে ৮৬ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। এরপর তার স্থান হয় ফেডারেল মেডিকেল সেন্টার, ফোর্ট ওয়র্থে। সংক্ষেপে টেক্সাসের এফএমসি কারাগারে। আবেগী মুসলিমরা কারাগারটিকে অত্যন্ত জঘন্য হিসেবে উপস্থাপন করেন। অথচ, এটি গুয়েন্তানামো বে’র মত অতটা জঘন্য নয়। এখানে আমেরিকার আরো দেড় হাজার অপরাধীও অবস্থান করে থাকেন।
তাহলে জঘন্যটা কী? সেটা আসলে আফিয়া সিদ্দিকির মিস্ট্রি- অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সময়টা। ২০০৩ সালে, ২০০৪ সালের মে মাসের আগে- আফিয়া সিদ্দিকির কিডন্যাপ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি আলোচনায় উঠে আসে। তৎকালীন ক্রিকেটার হিসেবে বিখ্যাত, নতুন রাজনীতিতে আসা ইমরান খান ব্যাপারটিতে প্রথম টর্চের আলো ফেলেন। তিনি এর জন্য মোশাররফের সরকারকে দায়ী করেন। তখন একটি টকশোতে ইমরান খান এবং মোশাররফের সময়ের জোচ্চুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল সালেহ হায়াত বিতর্কে বসেন। সেখানে ফয়সাল আফিয়াকে জঘন্য সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করেন। তার এই শব্দমালা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আফিয়া পাকিস্তান বা আমেরিকার অধীনে আছে। এই বিষয় তো ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ, যদিও অফিশিয়ালি স্বীকৃত নয় যে- আফিয়া সিদ্দিকিকে ২০০৩ সালেই আমেরিকা গ্রেফতার করেছিল। তার উপর নির্যাতন- যৌন নির্যাতন করেছিল। এমনকি যৌন নির্যাতনের ভিডিও অনলাইনে পর্যন্ত প্রচার করেছিল। পরবর্তীতে মানবাধিকার আইনে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সেগুলো ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে বিশ্বের সামনে মার্কিন ‘ক্লিন ফেস’ স্পষ্ট রাখার জন্য তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে অফিশিয়ালি বিচারের নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।
এগুলো তো প্রসিদ্ধ জালিয়াতি। আমার প্রসঙ্গটা অন্য ‘ক্লিন ফেস’ মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের ব্যাপারে। ইমরান খান, যিনি তৎকালীন আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি ও পাকিস্তানের মোশররফ সরকারের সবচে বড় সমালোচক ছিলেন এবং আফিয়া সিদ্দিকির ব্যাপারে সবচে বেশি সোচ্চার ছিলে; তিনি কেন এখন পাকপ্রধান হবার পরও আফিয়া সিদ্দিকিকে মুক্ত করতে পারছেন না? তালেবান, যাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আফিয়া সিদ্দিকিকে গ্রেফতার দেখিয়েছিল মার্কিন অথরিটি এবং এখন মার্কিনের সাথে শান্তিচুক্তি করছে; তারা কেন চুক্তির বিষয়বস্তুতে আফিয়া সিদ্দিকির উল্লেখ করতে পারছেনা? কেউই কেন এখন আফিয়া সিদ্দিকির কথা বলছে না? একটা প্রসিদ্ধ এবং মিথ্যা জবাব আছে এই প্রসঙ্গে- তারা আফিয়া সিদ্দিকিকে ব্যবহার হয়ে যাওয়ার পর আফিয়া সিদ্দিকিকে ভুলে গিয়েছে। এই দাবিটা আসলে জেদ এবং একগুঁয়েমি থেকে আসা। আসল ব্যাপারটি জানতে হলে কিছুটা অপ্রিয় সত্য জানতে হবে। সত্যের কিছু অংশ সত্য, কিছু অংশ ‘বানানো সত্য’।
২০০২ সালে আফিয়ার প্রথম স্বামীর সাথে ডিভোর্সের কারণ ছিল, আফিয়া সিদ্দিকির আল কায়েদার পক্ষপাতিত্ব। তার তখনকার স্বামী তাকে ফাঁসিয়ে দেয়। তার ইমেইল ইউজ করে ১০০০ ডলারের মিলিটারি আর্মস ক্রয় করে। এজন্য প্রথমবারের মত আফিয়া মুখোমুখি হন এফবিআইয়ের। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর তারা পাকিস্তানে আসেন এবং তাদের তালাক হয়ে যায়। সব ঠিকই চলছিল, কিন্তু আফিয়া এবার গোপনে আল-কায়েদার সাথে সক্রিয় হয়ে যান। টুইন টাওয়ার হামলার পরিকল্পনাকারী খালিদ শাইখ মুহাম্মাদের ভাতিজা আম্মার বেলুচির সাথে গোপনে বিয়ে করেন। এবং যেকোনো প্রসঙ্গে তাদের উভয়কে সাহায্য করেন। তবে সেগুলো কোনোভাবেই যুদ্ধ সম্পর্কিত সাহায্য ছিল না।
২০০৩ সালের শুরুর দিকে খালিদ শাইখ মার্কিনদের হাতে গ্রেফতার হন। তাকে ওয়াটারবোর্ডে (জল নিপীড়ন) ধারাবাহিক অত্যাচার চালানো হয়। তখন তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সত্য বলে দেন। বলে দেন বলতে তখন বলাটা নিজের অধীনে থাকেনা। পানির কারণে মস্তিষ্কের উপর ব্যক্তির কোনো কর্তৃত্ব থাকেনা। তার কথার ভিত্তিতে আম্মার বেলুচিকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এর আগেই আফিয়া সিদ্দিকিকে গ্রেফতার করা হয়। সবগুলো গ্রেফতারের মধ্যে আফিয়ার গ্রেফতারই ছিল আনঅফিশিয়াল। কারণ, আফিয়ার বিরুদ্ধে তাদের কোনো শক্ত প্রমাণ ছিল না। এমনকি আম্মারের সাথে তার বিয়ে বা সাক্ষাতের কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি মার্কিন প্রসিকিউটররা। যদিও মার্কিন ধারাবাহিক অত্যাচারের পর আফিয়া এফবিআইয়ের কাছে অনেক বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন বলে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের দাবি। আফিয়া আদালতে সেসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
২০০৩ সালে তাকে গ্রেফতার করে বাগরামের কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ২০০৮ সালে মোশাররফের পতনের একটা অন্যতম মুখ্য কারণ ছিল, আফিয়ার মিস্ট্রি কেইস। আমেরিকা পরবর্তী সরকার আসার পর ব্যাপারটা ঘোলাটে হবার আশংকা করে। তাই ১৭ই জুলাই আফিয়াকে গ্রেফতার দেখায় গজনির পুলিশ। এরপর একই বছর ১৫ই নভেম্বর পাকিস্তানের সংসদে আফিয়াকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিল পাশ হয়।
এতকিছুর পরও আফিয়াকে ফিরিয়ে আনতে না পারার কারণ হচ্ছে, ততদিনে আমেরিকা আফিয়ার আল কায়েদা হবার ব্যাপারে সকল প্রমাণ তৈরি (?) করে ফেলেছিল। আমেরিকা পরিস্থিতি এতটা শক্ত করেছে যে, আফিয়ার জন্য কোন ফোকর রাখেনি। না আইনগতভাবে, আর না পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে। কারণ, এখন আফিয়ার পক্ষে কথা বলার অর্থ হচ্ছে- আল কায়েদার পক্ষে বলা। ২০১২ সালে মার্কিন সিনেটর মাইক গ্রেভেল সিদ্দিকি পরিবারের সাথে সাক্ষাত করেন। তিনি জানান, আফিয়ার সাথে অন্যায় করা হয়েছে। পাকিস্তান আর মার্কিন অথরিটি চাইলে দুইদিনের মধ্যে আফিয়াকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। কিন্তু তারা সেটি করবেনা।
মাইক গ্রেভেলের কথা সত্য, কিন্তু বাস্তব নয়। যেহেতু আমেরিকা একবার আফিয়াকে আল কায়েদা প্রমাণ করেছে, (যদিও মহিলা সদস্য তৈরির ব্যাপারে আল কায়েদার তৎকালীন অফিশিয়াল কোনো বক্তব্য নেই) তাই তারা কোনভাবেই এটাকে আবার রিভাইভ করবেনা। এজন্যই ইমরান খান তাকে নিয়ে আলাপ চালিয়ে সফল হননি। একইভাবে, তালেবানের শর্তে যেহেতু ‘আল কায়েদামুক্ত’ আফগানিস্তানের ব্যাপারে উল্লেখ আছে। তাই তালেবান আমেরিকার প্রমাণ করা আল কায়েদার মহিলা সদস্য আফিয়া সিদ্দিকিকে মুক্ত করার কোনো শর্ত দিয়ে এই শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করতে চাইবেনা।
অনেকে আল কায়েদাকে তালেবানের কাছে শপথবদ্ধ একটি দল হিসেবে দাবি করেন। আফিয়া ফ্যাক্টে আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে ঘেঁটে দেখেছি। ২০১২/১৩ এর পরে আল কায়েদার পক্ষ থেকে প্রমাণ পেলেও তালেবানের পক্ষ থেকে কোন স্বীকৃতি খুঁজে পাইনি। ২০১০ সালে সাইয়েদ সেলিম শেহজাদের আল কায়েদার পলিসিগুলো এক্সপোজ করার পর থেকে, বিশেষত বিন লাদেন আর মোল্লা ওমরের শাহাদাতের পর অবশ্যই তালেবান তার নীতি ও যুদ্ধ পলিসি পরিবর্তন করেছে। ২০১০ এর আগে আল কায়েদার ইশারায় বা বুদ্ধিতে তালেবান লড়াই করত। যদিও তখন তালেবান ব্যাপারটি অতটা খেয়াল করে দেখেনি। কিন্তু শেহজাদের এক্সপোজের পর তারা অবশ্যই নিজেদের জন্য আল কায়েদার প্রভাবমুক্ত একটি শুরা গঠন করেছে। এসব কারণেই হয়ত আফিয়া সিদ্দিকির মুক্তি তালেবানের কাছে কোন বিশেষ অর্থ বহন করেনা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আফিয়া সিদ্দিকির মুক্তি কীভাবে হবে? ২০১৯ সালে ইমরান খান আফিয়া সিদ্দিকির বিনিময়ে শাকিল আফ্রিদিকে মুক্তির ব্যাপারে আলাপ চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। ততদিন পর্যন্ত ইমরান খানকে আফিয়া সিদ্দিকির পক্ষে বলে ধরা হচ্ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর ভারত তাদের এক অপরাধী বন্দিনীকে আমেরিকা থেকে ছাড়িয়ে আনার পরও ইমরান খান এব্যাপারে চুপ থাকায় আফিয়া মুভমেন্ট পরোক্ষভাবে খানকে এর জন্য দোষারোপ করছেন। আসলে খানের এই ক্ষেত্রে করার মত কিছু নেই, আমেরিকা নিজে থেকে যতদিন আফিয়ার ব্যাপারে রিভাইভ না করবে- ততদিন খান যতই বলুন না কেন, আফিয়াকে ফিরাতে সক্ষম নন।
এইমুহূর্তে এফএমসি কারাগারে করোনার প্রচুর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। আশা করা যায়, সবকিছুর পরও এই উপলক্ষ্যে আফিয়া সিদ্দিকি মুক্তি পাবেন। যদি এই ক্ষেত্রকে উপলক্ষ্য বানিয়ে ইমরান খান কোন বিশেষ পদক্ষেপ না নেন, তবে কোন সন্দেহ ছাড়াই তার পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন উঠানো বেইনসাফি হবেনা।