তাবলিগ জামায়াতে জিহাদের তাবলিগ – প্রথম পর্ব

তাবলিগি আকাবিরদের সাথে মুলাকাত

আমার বন্ধু এবং তাবলিগি জামায়াতের সাথী মৌলভি ইকবাল সাহেব পূর্ববর্তী বছরে (১৯৯২) করা (মারকাযুদ্দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদের ইজতেমা সম্পর্কিত) প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। এই ধারাবাহিকতায় এবার আমি তার সাথে মুলাকাত করে বললাম, আপনি আমাকে তাবলিগি উলামায়ে কেরামের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিন। যাতে আদ-দাওয়াহ পত্রিকার জন্য অবিতর্কিত প্রতিবেদন করতে পারি। তিনি বললেন, আপনি কী প্রশ্ন করবেন? আমি বললাম, (মরহুম) মাওলানা ইলয়াস সাহেবের হাতে বাইয়াত নেওয়া হচ্ছে; এর বৈধতা কী? উনি বলতে লাগলেন, এটা তেমন কোনো বিষয়ই নয়। আপনি খামোখাই এটাকে বড় করে দেখছেন। বন্ধুকে আমি বললাম, আপনি আমার সাক্ষাৎ হযরতজির সাথে করিয়ে দিন, যাতে আমি এই মাসয়ালা তাকেই জিজ্ঞেস করে নিতে পারি। তিনি বললেন, তাকে এই ধরণের প্রশ্ন করার অধিকার কারোও নেই। আর কার এতো সাহস যে সেখানে ঢুকবে? আমি বললাম, আপনি আমার মুলাকাত তো করিয়ে দিন। বাকি কাজ আমি সামলে নিব। তিনি বললেন, ইয়ে লাট বেরাদর নওজোয়ান কিস মরয কা ইলাজ হ্যায়ঁ? — এই যুবক কালের লাটসাহেবি স্বভাব কোন রোগের চিকিৎসা? তার উত্তম আদর্শের নমুনা দেখে আমি নমনীয় হয়ে বললাম, আপনি মাওলানা সাইদ সাহেবের সাথেই সাক্ষাৎ করিয়ে দিন। যিনি একদম নিকটেই বসে ছিলেন। তিনি বললেন, মাওলানা সাহেবের শরীর ভালোনা, তবুও আমি উনার সাথে আপনার ব্যাপারে কথা বলবো। এখন আপনি উলামাদের মজলিসে গিয়ে বসুন। মাওলানা উমর পালনপুরির বয়ান শুনুন। আমি বললাম, উত্তম প্রস্তাব! চলুন। উলামাদের মজলিস। মাওলানা সাহেবকে প্রশ্ন করে মজা পাওয়া যাবে আর জবাবও বেশ উত্তম হবে। আমার বন্ধু বললেন, ভাই! সেখানে প্রশ্ন করার অনুমতি কোনো সময়ের জন্যই নেই। আপনি সেখানে শুধু বয়ান শুনবেন। যাই হোক! আমি তার সাথে উলামাদের মজলিসে গিয়ে মাওলানা সাহেবের বয়ান শুনলাম।
এই বয়ান কী ছিলো, সেটা সামনের পাতায় উল্লেখ করবো। ইনশাআল্লাহ!

আমি দ্বিতীয়বার মাওলানা সাইদ খান সাহেবের অবস্থানের দিকে গেলাম। যখন লোকজনের আসা-যাওয়া কিছুটা বন্ধ হয়ে এলো, তখন আমি মাওলানা সাহেবের নিকটবর্তী হলাম। নিজের পরিচয় মারকাযুদ্দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদের জিহাদি সূত্রে বর্ণনা করলাম এবং প্রশ্ন শুরু করলাম।

* প্রথম প্রশ্ন– ধারাবাহিক তিন বছর যাবৎ আপনাদের ইজতেমায় আমরা দেখে আসছি যে, মাওলানা ইনআমুল হাসানের মাধ্যমে মাওলানা ইলয়াসের হাতে বাইয়াত করা হয়। যেখানে মাওলানা ইলয়াস সাহেব ১৯৪৪ সালেই ইন্তেকাল করেছেন। যদি এধরণের বাইয়াত জায়েযই হতো তাহলে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাইয়াত করতেন।

* দ্বিতীয় প্রশ্ন– আপনারা সবসময় দাওয়াত আর তাবলিগের কাফেলা বের করেন। অপরদিকে জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য আপনাদের পক্ষ থেকে কোনো একজন ব্যক্তিকেও প্রেরণ করা হয়না, বরং তার জন্য অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হয়না। যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রিদওয়ানুল্লাহি আজমাইন জিহাদি কাফেলায় বের হতেন।

* তৃতীয় প্রশ্ন– আপনারা লোকদেরকে এটা বলেন যে, আল্লাহ তায়ালার হুকুম এবং নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরিকায় কামিয়াবি। তাহলে কেন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরিকা অনুযায়ী জিহাদি কাফেলা প্রেরণ করা হয়না?
মাওলানা সাইদ খান সাহেব সত্তর আশি বছরের বয়োবৃদ্ধ বুযুর্গ। আমার প্রশ্নগুলো মনযোগ সহকারে শুনতে থাকলেন।

মাওলানার জবাব : আমি সাধারণ একজন কৃষক

তিনি বললেন, বাইয়াত সম্পর্কিত মাসয়ালা হযরতজির নিকট জিজ্ঞাসা করুন। আমি বললাম, অনেক চেষ্টা করেও হযরতজির সাথে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হইনি। তিনি বললেন, সে যাই হোক, আপনি তার কাছেই জিজ্ঞাসা করুন। আমি বললাম, আপনি জিহাদ সম্পর্কে কিছু বলুন। বললেন, আমি মুজাহিদ নই। আমি বললাম, আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিলো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ করে ইলম অর্জন করবো। আপনি এসব প্রশ্নের জবাব দিয়ে আমাকে পথপ্রদর্শন করুন। অতঃপর মাওলানা সাহেব বললেন, ইলমের বিষয়ে উলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করুন। হাদিসের বিষয়ে মুহাদ্দিসিনের নিকট যোগাযোগ করুন। জিহাদের বিষয়ে মুজাহিদিন কিছু বলে থাকবেন। আমার ইমান কমযোর। আর আমি আলিমও নই, মুহাদ্দিসও নই আর মুজাহিদও নই। আমি তো সাধারণ একজন কৃষক।

উনার এই কৃষকসুলভ উত্তর শুনে আমার অনিচ্ছাকৃতই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐ হাদিসখানা স্মরণে এসে গেলো; যেখানে তিনি বলেছেন,

যখন তোমরা সুদি কারবারে জড়িয়ে পড়বে, গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে, কৃষিকাজ তোমাদের পছন্দনীয় কর্ম হবে আর জিহাদ ছেড়ে দিবে; তখন আল্লাহ তোমাদের উপর অপমানকে বিজয়ী করে দিবেন।

(আহমাদ, আবু দাউদ)

আমার ঐ তাবলিগি বন্ধু মাওলানা সাহেবেরও বিশেষ সহযোগী ছিল। আমি তার দিকে ইশারা করে বললাম, আমি আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য উনার মাধ্যমে সময় নিয়েছিলাম। এই প্রশ্ন তো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাকে এর জবাব কে দিবে? মাওলানা সাহেব চুপ থাকলেন। উনার সাথে বসা লোকেরা বললো, মাওলানাকে ডিস্টার্ব করোনা। মাওলানা সাহেবের এক খাদেম আমার কাঁধ ধরে বাহিরে চলে যেতে বললো। কিন্তু আমার বন্ধু মৌলভি ইকবাল সাহেব বললেন, তাকে বসতে দিন। এরপর আমি সেখানে আরো কিছু মিনিট বসে বন্ধুর সাথে আলাপ করলাম। আর তিনি আমাকে এটাই বলতে লাগলেন, এই বাইয়াত সম্পর্কিত মাসয়ালা তেমন বড় গুরুত্ব বহন করেনা। আমরা তো আর স্টেজে এটার জন্য তারগিব দিচ্ছিনা। মনে হয় যেন, গোপনে ভুল মাসয়ালার তারগিব দিলে সহিহ থাকে আর স্টেজে ঐ মাসয়ালা ভুল হয়ে যায়।
– তাবলিগি জামায়াত : এক তাহকিকি জায়েযাহ; পৃষ্ঠা: ৩০-৩৩ (লেখক: উবাইদুর রহমান মুহাম্মাদি)

১৯৯২ সালের ১৩ই নভেম্বর রাইওয়েন্ডের ইজতেমায় তৃতীয়বারের মত উপস্থিত হয়ে তাবলিগের কিছু মৌলিক ভুল উল্লেখ করে তৎকালীন সালাফি মুজাহিদদের সংস্থা মারকাযুদ্দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদের সাময়িকী প্রথমবারের মত প্রতিবেদন পেশ করে। এর ফলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে পরের বছর লেখক মুজাহিদ উবাইদুর রহমান মুহাম্মাদি সংগঠনটির পক্ষ থেকে সেখানে যান। সেখান থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে মাওলানা উবাইদুর রহমান তাহকিকি জায়েযাহ নামে একখানা পুস্তিকা লিখেন।

তৎকালে ইজতেমায় মারকাযুদ্দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদের একটা স্টলও ছিল। সেখান থেকে জিহাদের জন্য দাওয়াহর কাজও চালানো হতো। বই পড়ানো হতো। অনেকে ভাববেন যে, ইজতেমায় যেহেতু স্টল নিতে পেরেছে তার অর্থ জিহাদের কাজেও তাবলিগি উলামাদের নিরব সমর্থন ছিলো। আসলে রাইওয়েন্ডের ইজতেমায় তখন মদের স্টলও ছিলো।

এক উঁচুদরের মুজাহিদ থেকে বিশ্বস্ত সূত্রে আব্দুল ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ আর মাওলানা তারেক জামিলের কাছে জিহাদের দাওয়াত নিয়ে যাবার ঘটনা শুনেছি। তারা মযলুমদের জন্য দুয়া করতে পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানান।

মাওলানা উমর পালনপুরির কাছেও জিহাদের দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। এর বিবরণ মাওলানা মুহাম্মাদি দিয়েছেন। সেই কারগুযারি নিয়ে ইনশাআল্লাহ অন্য আরেকদিন….

অন্যান্য মিডিয়ায় আমাকে ফলো করুন:
বারা ইবনুল মালিক আল আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফ্যান।
Posts created 5

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Related Posts

Begin typing your search term above and press enter to search. Press ESC to cancel.

Back To Top