ফারাবি-ইবনে সিনা-আব্দুস সালাম: কার ফাতওয়ায়ে কীভাবে কাফের?

আব্দুস সালাম। পাকিস্তানের বিখ্যাত নোবেলপ্রাপ্ত পদার্থবিজ্ঞানী। আনোয়ার সাদাতের শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মত এই নোবেলটি মুসলিম দেশে প্রাপ্ত হয়। অনেক ইসলামি প্রবন্ধ-নিবন্ধ-বইয়ে মুসলিম নোবেলপ্রাপ্তদের মাঝে তার নাম লেখা হয় নির্বিচারে।

ইবনে সিনা। পুরো নাম আবুল হুসাইন আলি। পরদাদার নাম ছিল সিনা। তার সাথে সম্পর্কযুক্ত করেই বলা হয়, ইবনে সিনা। মুসলিম বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত। জন্ম ইসমাইলি শিয়া পরিবারে। সুন্নি আমিরদের অধীনে জীবনের অধিকাংশ সময় চাকুরি করে কাটিয়েছেন। আল কানুন ফিত্তিব্ব তার প্রসিদ্ধ চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর লিখা কিতাব। তার নামেই নামকরণ করে বাংলাদেশের বিখ্যাত দি ইবনে সিনা হাসপাতালটি দাঁড়িয়ে আছে।

আল ফারাবি। মূল নাম মুহাম্মাদ। উপাধি আবু নাসার। কাজাখিস্তানের ফারিয়াব শহরের দিকে নিসবত করে বলা হয়, ফারাবি। জাঁদরেল দার্শনিক। এমনকি, ইবনে সিনাও তার দ্বারা প্রভাবিত।

কাদিয়ানিরা অমুসলিম। কোনোভাবেই তারা মুসলিম হতে পারেনা- এব্যাপারে উম্মাহর ইজমা বিদ্যমান। কিন্তু কাদিয়ানি আব্দুস সালাম নোবেল পাবার ফলে মুসলিম হিসাবে “নাম” পেয়ে গেল। কেবলই তার খ্যাতির ফলে। অথচ নোবেল প্রাইজেও তার পরিচয় লিখা: “আহমাদি মুসলিম”। ২০১৪ সালে তার কবর ফলক থেকে মুসলিম শব্দটি মুছে ফেলা হয় আহমাদি হবার কারণে।

এই বিষয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ইবনে সিনাকে নিয়ে। বিভিন্ন ফুকাহায়ে ইসলাম তাকে তাকফির করেছেন স্পষ্টভাবে। তবে দামিশকের শাফিয়ি আলিম ইবনে খাল্লিকান রাহিমাহুল্লাহ তার তাওবাহর ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। যার ভিত্তিতে একই অঞ্চলের তার পরবর্তী ইবনুল কাসির রাহিমাহুল্লাহ ইবনে সিনার তাওবাহর ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছেন। এই দুজনের বর্ণনাটি ইতিহাসের পর্যালোচনা হিসেবেই ছিল। ফাতওয়া হিসেবে নয়।

ইবনে খাল্লিকান ইবনে সিনার মৃত্যুর আগমুহূর্তের অবস্থা সম্পর্কে বলেন, অসুস্থতা চরম পর্যায়ে পৌঁছলে সে গোসল করে তাওবা করল, তারপর দাসদাসী আযাদ করে দিল, নিজের সাথের সবকিছু গরিবদের মাঝে দান সাদকা করল এবং প্রতি তিনদিনে কুরআন খতম করতে লাগলো আর এই অবস্থাতেই ইন্তেকাল করল।(১) ইবনে কাসির আল বিদায়াহতে তার তাওবাহর বিষয়টি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছেন।(২)

ইবনে সিনাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ। তিনি তার বিশটি মতবাদকে খন্ডন করেন। যার মধ্য থেকে তিনটিতে তাকে কাফির বলে আখ্যায়িত করেন।(৩) ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তাকে রাফেযি বাতেনি কাফির হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷(৪) ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ তার নাস্তিকতার বিশদ বর্ণনা দেবার পর তাকে মুলহিদদের সর্দার হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, মক্কার মুশরিকদের দ্বীন ইবনে সিনা আর ফারাবিদের দ্বীন থেকে উত্তম।(৫) ইমাম যাহাবি রাহিমাহুল্লাহ গাযালির সূত্রে তাকে এবং ফারাবিকে তাকফির করেন।(৬) শাফিয়ি বিখ্যাত আলিম ইমাম ইবনুস সালাহ রাহিমাহুল্লাহ তাকে মানুষের মধ্যকার শয়তান বলেছেন।(৭)

এযুগের আলিমদের মধ্যে ইমাম আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রাহিমাহুল্লাহ তার ব্যাপারে বলেন, ইবনে সিনা মুলহিদ, যিন্দিক, কারামাতি শিয়া এবং শিরকের দিকে আহ্বানকারী।(৮) ইবনুল বায রাহিমাহুল্লাহ তার সমালোচনা করে বলেন, তার নামে নাম রাখা উচিত নয়।(৯)

এগুলো সবই সেসব আলিমদের বক্তব্য, যারা বিন্দু বিন্দু যাচাই করতেন। ইবনে খাল্লিকান আর ইবনুল কাসিরের বক্তব্য যদি ইবনে সিনার ক্ষমার পক্ষে দলিল পেশ করা হয় তাহলে দুইটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। প্রথমটি হচ্ছে তারা কোনো খাস তাওবাহর উল্লেখ করেননি বা কোনো ভ্রান্তি থেকে উঠে আসার স্বপক্ষে প্রমাণ দেননি। দ্বিতীয়তঃ তারা অন্যদের তাকফির করাকে রদ করেননি।

তাদের উভয়ের কিতাব দুটিই ইতিহাস সংক্রান্ত। ইতিহাস আর ইলমুল ফিকহের ফারাক আহলুল ইলম ও তালিবুল ইলমরা জ্ঞাত। তাকফির করা বা কারুর ইসলামের স্বীকৃতি ইতিহাসের ভিত্তিতে হয়না, ইলমুল ফিকহের ভিত্তিতে হয়। যারা মনে করেন ইবনে খাল্লিকানের তাওবাহর হিকায়াত তাকফিরকারীদের পর্যন্ত পৌঁছেনি, তারা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি বা ইবনুল বায রাহিমাহুমাল্লাহের ব্যাপারে কিরূপ ধারণা রাখতে পারেন!

মানুষের পরম্পরায় বর্ণিত ইতিহাসের সনদ ইতিহাসের ক্ষেত্রে। ফিকহের সনদ ফিকহের ক্ষেত্রে৷ আর সবচেয়ে শক্তিশালী সনদ হাদিসের, সেটাও নির্দিষ্ট হাদিসের ক্ষেত্রে। এগুলোকে এলোমেলো করাটা খুব একটা উচিত নয়।

আল্লাহ তায়ালাই সঠিক বিষয়ে জ্ঞান দানকারী।

___________
হাওয়ালাঃ-
১। ওয়াফাইয়াতুল আ’ইয়ান লিইবনে খাল্লিকান, খন্ড:২, পৃষ্ঠা:১৬০ প্রকাশনায়: দারে সাদের বৈরুত।
২। আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ লিইবনে কাসির। ৪৭০ হিজরি সন অনুচ্ছেদ।
৩। আল মুনকিয মিনাদ দ্বলাল লিইমাম গাযালি।
৪। আর রাদ্দু আলাল মানতিক্বিয়্যিন লিইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৪১-১৪২।
৫৷ ইগাসাতুল লাহফান লিইবনিল কাইয়্যিম, খন্ড:২, পৃষ্ঠা: ২৬৬-২৬৮, প্রকাশনায়: দারুল মা’রিফাহ, বৈরুত।
৬। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা লিয যাহাবি, খন্ড:১৭, পৃষ্ঠা:৫৩৫, প্রকাশনায়: মুআসসিসাতুর রিসালাহ, বৈরুত।
৭। ফাতাওয়া ও মাসাইলে ইবনুস সালাহ, খন্ড:১, পৃষ্ঠা: ২০৯, প্রকাশনায়: দারুল মা’রিফাহ বৈরুত।
৮। ফয়যুল বারি আলা শারহি বুখারি লিইমাম কাশ্মিরি, খন্ড:১, কিতাবুল ইলম, পৃ: ২৪৬, প্রকাশনায়: দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ বৈরুত।
৯। আল ফাওয়াইদুল জালিয়্যাহ লিযযাহরানি, পৃষ্ঠা: ৩৭, প্রকাশনা: দারে তাইয়িবাহ।

অন্যান্য মিডিয়ায় আমাকে ফলো করুন:
বারা ইবনুল মালিক আল আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফ্যান।
Posts created 4

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।