আন্দালুসের পতন এবং এপ্রিল ফুল প্রসঙ্গ

{{يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقٌۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓا۟ أَن تُصِيبُوا۟ قَوْمًۢا بِجَهَٰلَةٍ فَتُصْبِحُوا۟ عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَٰدِمِينَ}}
অর্থঃ হে ইমানদারগণ! যদি কোনো ফাসিক কোনো খবর নিয়ে তোমাদের কাছে আসে তখন তোমরা যাচাই করে দেখবে, পাছে অজ্ঞাতসারে তোমরা কোনো লোকদলকে আঘাত করে বস, আর পরক্ষণেই দুঃখ কর তোমরা যা করেছ সেজন্য। (আল হুজুরাত:৬)

عن أبي هريرة، أن النبي صلى الله عليه وسلم قال ‏ “‏ كفى بالمرء إثما أن يحدث بكل ما سمع ‏”‏

আবু হুরাইরাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি করিম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ কোন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে কোন কথা শোনামাত্রই (যাচাই না করে) বলে বেড়ায়। (আবু দাউদ, হাদিস:৪৯৯২;
সনদ সহিহ)

আমরা আন্দালুস থেকে বিতাড়িত হই ১৪৯২ সালের ২রা জানুয়ারি। অথচ ছোটকাল থেকেই আদর্শ নারীসহ বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে মুখস্থ করে এসেছি, ১৪৯২ সালের পহেলা এপ্রিল ছিল আমাদের আন্দালুস হারানোর দিন।

আন্দালুসে পরাজিত হবার ঘটনাটা এভাবে বর্ণনা করা হয়-
গ্রানাডার আমির আব্দুল্লাহ বোয়াবদিল আত্মসমর্পণ করলে ১৪৯২ সালের পহেলা এপ্রিল মুসলমানদেরকে বলা হয়- যারা মসজিদে প্রবেশ করবে অথবা জাহাজে চড়ে হিজরত করবে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তখন লক্ষ লক্ষ মুসলিম মক্কা বিজয়ের ঘটনা স্মরণ করে তাদেরকে বিশ্বাস করলেন। কিন্তু মসজিদে প্রবেশ করার পর তাদেরকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

এটা তো বেশ সংক্ষিপ্তরূপ। আরো চটকদার শব্দ ব্যবহার করে গল্পটি বর্ণনা করা হয়। ঘটনার শেষে বলা হয় যে, রানী ইসাবেলা রাজা ফার্নিড্যাণ্ডকে জড়িয়ে ধরে (?) খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললো, ” Oh! Muslim! How fool you are!” এখান থেকেই নাকি এপ্রিল ফুলের উদ্ভব।

আসলে এপ্রিল ফুল শুরু কী নিয়ে হলো- এই নিয়ে সমাজে অনেক গালগল্প প্রচলিত আছে। যেমন- সেদিন পড়লাম মুঘল শেষ রাজা বাহাদুর শাহের পতনের ঘটনা থেকেই এপ্রিল ফুলের ঘটনার উদ্ভব। আবার কেউ বলে, টিপু সুলতানের সাথে মীর সাদিকের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা থেকে এপ্রিল ফুলের পালন শুরু হয়। এরকম আরো গালগল্প প্রচলিত আছে।

এপ্রিল ফুল নিয়ে যৎসামান্য অনুসন্ধান চালালেই জানা যাবে যে, নিজ নিজ পরিসরে ভ্রান্ত গল্প ছড়ানো হয়েছে এই দিনটিকে ঘিরে। ব্রিটিশরা ১৩শ খৃস্টীয় শতকের ব্রিটিশ রাজার বোকা বনে যাবার ঘটনাকে, ফরাসীরা ১৬শ শতকের ক্যালেন্ডার পরিবর্তন ঘটনাকে আবার সংরক্ষণশীল খৃস্টানরা বাইবেল অনুসারে নুহ (আ.) এর বোকা হওয়ার (?) ঘটনাকে এপ্রিল ফুলের উদ্ভবের ঘটনা বলে প্রচার করে থাকে।

এগুলো আসলে কোনোটাই নিশ্ছিদ্র নয়। কোনোটা তো হেসেই উড়িয়ে দেওয়া যায়। আবার কোনোটা একটু বেশি প্রচলিত হয়ে যাওয়ায় সেটির ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করতে হয়। আমাদের উপমহাদেশ আন্দালুস থেকে বেশ দূরে হওয়ায় আমাদের সমাজে আগুনে পোড়ার থিওরি বেশ প্রচলিত হতে পেরেছে।

আমি ইসলামি আন্দালুসের পতনের ঘটনার যতগুলো বিশ্বস্ত সূত্র পেয়েছি; সেগুলোর মধ্যে সবচে কাছাকাছি ছিল আল মাকারির “আন-নাফহুত তিব” গ্রন্থটি, আরেকটি ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ইংরেজি একটি বই। কলম্বাস রানী ইসাবেলার অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল। এমনকি, সে গ্রানাডা পতনের চুক্তির সময়েও সেখানেই মওজুদ ছিল। বইটি আমি দেখিনি। কিন্তু বিশ্বস্ত অনেকেই ইংরেজি বইটির সূত্র দিয়ে এটাই বর্ণনা করেছেন, সেখানে কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বর্ণনা করা হয়নি। কিছু ইসলামপ্রেমী হয়তো বা বলতে চাইবেন যে- সে ক্রিশ্চান, তাই স্বধর্মের অবমাননা হয় এমনকিছু সে লিখেনি।

কিন্তু আবুল আব্বাস মাকারি? আলজেরীয় মুসলিম এমন গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক, যিনি কমপক্ষে স্পেনের মুসলিম ইতিহাসে নির্ভরযোগ্য। এমনকি, বর্তমানের বিখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক ড. রাগিব সিরজানি পর্যন্ত আল মাকারির হাওয়ালায় গ্রানাডার পতনের বর্ণনা দিয়েছেন।
আগ্রহীরা নাফহুত তিব্বের ৪র্থ খন্ডের ৫২৫-৫২৬ নং পৃষ্ঠা দেখতে পারেন। (ডাউনলোড লিংক)

সহজসাধ্যতার জন্য বাংলায় অনুদিত ড. রাগিব সিরজানির “আন্দালুসের ইতিহাস” বইটির ১ম খন্ডের শেষের দিকটা চেক করতে পারেন। বইটির আরবি কিসসাতু আন্দালুস প্রথম খন্ডের ৬৮৮ পৃষ্ঠার সুকুতুল গারনাতাহ (বাংলা করলে- গ্রানাডার পতন) পরিচ্ছেদে আমি আগুনের ঘটনার কোনো আঁচড় সেখানে পাইনি। (আমার কাছে বাংলা বইটি নেই, তাই বইটির সঠিক পৃষ্ঠা নং দিতে পারলাম না।)

উপসংহার টানলাম না, যারা সত্যকে ভালোবাসে তাদের জন্য এতোটুকু যথেষ্ট।

اللهم أرنا الحق حقاً وارزقنا إتباعه وأرنا الباطل باطلا وارزقنا اجتنابه –

অন্যান্য মিডিয়ায় আমাকে ফলো করুন:
বারা ইবনুল মালিক আল আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফ্যান।
Posts created 5

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Begin typing your search term above and press enter to search. Press ESC to cancel.

Back To Top